খেলাধূলা সংবাদ : বাঁ পায়ের স্কিল, মুভমেন্ট এবং সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় পৌঁছে যাওয়ার ক্ষমতা দেখে অনেকেই তাঁকে তুলনা করেন বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলারের সঙ্গে। কিন্তু ছায়া কেটে কীভাবে বেরিয়ে আসতে হয়, সেটা তিনি ভালই জানেন। তাই পাশে লিওনেল মেসির মতো সতীর্থ থাকা সত্ত্বেও, পাওলো দিবালা আজ বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা উঠতি তারকার নাম।

আর্জেন্টিনার কর্ডোবার লাগুনা লারগায় জন্ম দিবালার। অবাক লাগলেও সত্যি, ফুটবল খেলাটা বোধ হয় জন্মের আগে থেকেও তাঁর কপালে লেখা ছিল। দিবালার বাবা অ্যাডোলফ প্রচণ্ড ঈশ্বরবিশ্বাসী ছিলেন। তিনি স্বপ্নে নাকি দেখেছিলেন, তাঁর এক সন্তান একদিন ফুটবল খেলে খুব নাম করবে। দিবালার একটু বড় হওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, তাঁর স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে। ছোট ছেলেকে ফুটবলার বানানোর জন্য উঠেপড়ে লাগেন তিনি। মধ্যবিত্ত পরিবার। ফলে স্বপ্ন সফল হওয়ার পথে অনেক বাধা এসেছে। এমনও হয়েছে, নিজের শেষ সম্বলটুকু খরচা করে তেল কিনে ছেলেকে অনুশীলনে পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু এত করেও ছেলেকে নামী দলে খেলতে দেখার স্বপ্ন সফল হয়নি অ্যাডলফের। দিবালার যখন ১৫ বছর বয়স, তখন তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

দিবালা আদতে তিন দেশের নাগরিক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর দাদা বোরশ প্রাণভয়ে পোল্যান্ড ছেড়ে আশ্রয় নেন আর্জেন্টিনায়। সেখানেই পাকাপাকিভাবে থেকে যান। ফলে পোল্যান্ডের নাগরিকত্ব রয়েছে দিবালার। আবার মায়ের দিক থেকে তিনি খেলতে পারতেন ইতালির হয়েও। মা অ্যালিসিয়া ইতালীয়। কিন্তু যে দেশে বেড়ে উঠেছেন, সেই দেশের হয়ে দিবালা খেলার সিদ্ধান্ত নেন। অনেকটা লিওনেল মেসির মতোই।

স্থানীয় ক্লাব ইনস্টিটিউটো অ্যাটলেটিকো সেন্ট্রাল কর্ডোবার থেকে ফুটবল জীবন শুরু দিবালার। আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় ডিভিশনে খেলতে নেমেই মাতিয়ে দিলেন তিনি। মারিও কেম্পেসকে টপকে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হয়ে গেলেন। প্রথম মৌসুমে ৪০ ম্যাচে ১৭ গোল করেছিলেন। ওই বয়সেই তাঁর দুর্ধর্ষ পারফরম্যান্স এবং ড্রিবলিং করার ঐশ্বরিক ক্ষমতা দেখে গোটা বিশ্বের বিভিন্ন ক্লাব থেকেই তাঁকে নেওয়ার জন্য দরাদরি শুরু হয়ে যায়। দিবালা শেষ পর্যন্ত যান ইতালির ক্লাব পালেরমোতে। এডিনসন কাভানি, জেভিয়ার পাস্তোরের মতো দক্ষিণ আমেরিকান তারকারা উঠে এসেছেন পালেরমো থেকে।

তবে পালেরমোতে প্রথম মৌসুম একেবারেই ভালো কাটেনি। মালিক মরিজিও জামপারিনির খেয়াল খুশি মতো কোচ পরিবর্তন করা প্রভাব ফেলে দিবালার খেলাতেও। তবে পরের মৌসুমে নতুন কোচ গিউসেপ্পে ইয়াচিনি দিবালা প্রচুর সুযোগ দেন। যা কাজে লাগান তরুণ আর্জেন্টিনীয়। তৃতীয় মৌসুমে আরও জ্বলে ওঠেন। সেবার তাঁর পাশে ছিলেন ফ্রাঙ্কো ভাজকুয়েজ। ৩–৫–২ ছকে সামনে ভাজকুয়েজের সঙ্গে জুটি বেঁধে সেবার ১৩টা গোল করেন দিবালা, সঙ্গে ১০টা অ্যাসিস্ট। তাঁর দুর্ধর্ষ ফর্ম দেখে আর্জেন্টিনীয় সংবাদমাধ্যম তাঁকে ডাকতে শুরু করে ‘লা জোয়া’ (দ্য জুয়েল) বলে।

দিবালার ফর্ম নজর এড়ায়নি ইতালির বড় ক্লাবগুলির। মিলানের সঙ্গে টানাটানির পর তাঁকে তুলে নেয় জুভেন্টাস। দেওয়া হয় ২১ নম্বর জার্সি, যা পরেছিলেন জিনেদিন জিদান এবং আন্দ্রে পিরলোর মতো তারকারা। প্রথম ম্যাচেই জুভেন্টাসে আগমন স্মরণীয় করে রাখেন ডিবালর। লাজিওর বিরুদ্ধে ইতালীয় কাপের ম্যাচে তাঁর করা গোলেই জেতে দল! ২০১৬ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে বায়ার্ন মিউনিখের বিরুদ্ধেও প্রথম পর্বে দারুণ খেলেছিলেন। তবে জুভেন্টাসে তাঁর সেরা পারফরম্যান্স গত বছর বার্সেলোনার বিরুদ্ধে। অ্যালিয়াঞ্জ অ্যারেনায় প্রথম পর্বের ম্যাচে বার্সাকে একার হাতে ছিন্নভিন্ন করে দেন তিনি। জুভেন্টাস জেতে ৩–০ ব্যবধানে। উল্টো দিকে থাকা মেসি সেদিন ছিলেন ম্লান।

জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক প্যারাগুয়ের বিপক্ষে। নিজস্ব দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও বারবার তাঁকে মেসির ছায়ায় থেকে যেতে হয়েছে। দু’জনে একই পজিশনে খেলায় সেভাবে জাতীয় দলের হয়ে সুযোগও পান না। মেসি নিজেও যে ব্যাপারটা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছিলেন। পাশাপাশি দু’জনের তুলনা টেনে আনা হয় বারবার। বিরক্ত দিবালা কিছুদিন আগে বলেই ফেলেছিলেন, ‘মানুষ জানে আমি মেসি নই। আমি দিবালা, এবং দিবালাই থাকতে চাই।’

দিবালার কাছে এই বিশ্বকাপ স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে, যদি তিনি সুযোগ কাজে লাগাতে পারেন। আর্জেন্টিনাও পেতে পারে মেসির উত্তরসূরি।

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY